বিজ্ঞান লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
বিজ্ঞান লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

মঙ্গলবার, ১৬ জানুয়ারি, ২০১৮

শনিবার, ৬ জানুয়ারি, ২০১৮

বুধবার, ২৭ ডিসেম্বর, ২০১৭

মঙ্গলবার, ২৪ জানুয়ারি, ২০১৭

সৌরজগৎ অধীশ্বর ( ২য় পর্ব )

সূর্য অভিমুখে প্রেরিত মহাকাশযান
সূর্য অভিমুখে যে কয়টি মহাকাশযান পাঠানো হয়েছে, সেগুলো হলো-

ইউলিসিস (.Ulysses.): এ মহাকাশযানটি মূলত ‘’ইউরোপিটয়ান স্পেস এজেন্সি’’ (ইসা) দ্বারা নির্মিত এবং মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা ‘নাসা’ (.NASA.) দ্বারা ১৯৯০ সালে মহাকাশে প্রেরিত হয়। ৩৭০ কেজির এ মহাকাশযারটি সূর্যের কাছে পৌঁছোনোর জন্য ও পরীক্ষানিরীক্ষা চালানোর জন্য বৃহস্পতির মহাকর্ষ শক্তি ব্যবহার করে, যাকে মহাকাশবিজ্ঞানের পরিভাষায় বলা যায়, ‘গ্র্যাভিটি অ্যাসিস্ট টেকনিক’। এর কক্ষপথ একে মেরু অঞ্চলের উপর দিয়ে নিয়ে যায়, যেখানে এটি উচ্চগতিসম্পন্ন গ্যাসের কণিকা শনাক্ত করে। সাধারণত এ অভিযানটির উদ্দেশ্য ছিল সোলার উইন্ড এর গতিপ্রকৃতি পর্যবেক্ষণ করা।
ট্রেস (.TRACE বা Transition Region and Coronal Explorer.) ‘নাসা’ (.NASA.) নির্মিত এ মহাকাশযানটি ১৯৯৮ সালে সূর্য অভিমুখে রওনা হয়। সূর্যেও করোনা এবং বর্ণমণ্ডল ও করোনার মধ্যবর্তী অঞ্চল পর্যবেক্ষণের জন্য এটি প্রেরণ করা হয়।
 হেসি (.HESSI বা High Energy Solar Spectroscopic Imager .): পৃথিবী থেকে প্রায় ১৫০ মিলিয়ন কিরোমিটার দূরে সৌরশিখার গতিবিধির ওপর নজর রাখতে ২০০১ সালে মহাকাশে একটি দূরবীন পাঠায় নাসা। এ স্পেস টেলিষ্কোপটিকে আটলান্টিক মহাসাগরের ওপর অবস্থিত একটি জেট লাইনার থেকে ছাড়া হয়। ‘পেগাসাস’ (.Pegasus.) নামের রকেটে করে এটিকে পৃথিবীর বাইরে তার কক্ষপথের দিকে ঠেলে দেওয়া হয়। ‘হেসি’ সৌরশিখার এক্স-রে ও গামা রে বিশ্লেষণ করেছে।

সূর্যগ্রহণ
গ্রহণ হচ্ছে কোনো গ্রহ নক্ষত্রের অন্ধকারাচ্ছন্ন অবস্থা। এ ধরনের ঘটনা ঘটে থাকে যখন মহাকাশে অবস্থিত কোনো জ্যোতিষ্কের ছায়া অপর কোনো জ্যোতিষ্কের উপর পড়ে থাকে অথবা যখন কোনো জ্যোতিষ্ক অপর কোনো জ্যোতিষ্কের সামনে দিয়ে অতিক্রম করার সময় সেই জ্যোতিষ্কটির আলোকে বাধা দান করে থাকে। সূর্যগ্রহণ ঘটে থাকে কেবলমাত্র পূর্ণচন্দ্র বা নিউমুন (.New Moon.) অবস্থায়। এ অবস্থায় চাঁদের ছায়া পৃথিবীর গা বরাবর অতিক্রম করে। ছায়াটি সাধারণত পৃথিবীর পশ্চিম থেকে পূর্ব বরাবর ঘণ্টায় ১৭০০ কি.মি. গতিবেগে অতিক্রম করে থাকে। এ ছায়া অঞ্চলে অবস্থিত লোকেরা তিন ধরনের গ্রহণের মধ্যে যে কোনো একপ্রকার গ্রহণই দেখে থাকে। এ তিন ধরনের গ্রহণগুলো হলো- পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণ, খণ্ডগ্রাস সূর্যগ্রহণ ও বলয়গ্রাস সূর্যগ্রহণ। তবে সূর্যগ্রহণ ঘটে কেবলমাত্র তখনই যখন চাঁদ সূর্য ও পৃথিবী একই সরলরেখায় অবস্থান করে। চাঁদের কক্ষপথের জন্য এ সরলরেখায় এসে পড়া ব্যাপারটা একটা ঘটনাচক্র। তবে প্রতি বছরই পৃথিবীর কোনো না কোনো অঞ্চল থেকে সূর্যগ্রহণ দেখা যায়ই। গ্রহণের সংখ্যা কোনো বছরে ২ থেকে ৫টা পর্যন্ত হতে পারে।

পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণ
পূর্ণগ্রাস গ্রহণের সময় সূর্যের উজ্জ্বল চাকতিকে একদম মাপে মাপে চাঁদের নিজস্ব চাকতি দিয়ে ঢেকে ফেলে। কিভাবে এটা সম্ভব? কারণ, সূর্যের ব্যাস পৃথিবীর ব্যাসের ১০৯ গুণ আর চাঁদের ব্যাস পৃথিবীর মাত্র এক চতুর্থাংশ। সূর্য চাঁদের চাইতে কয়েকশ গুণ বড় হলেও আকাশে এ দুই জ্যোতিষ্ককে আমরা সমান মাপের দুটি গোল চাকতি হিসেবে দেখি। কারণ হলো পৃথিবী থেকে এদের নিজ নিজ দূরত্বের সঙ্গে এ দুই জ্যোতিষ্কের নিজস্ব ব্যাসের একটা অদ্ভুত এবং আকস্মিক মিল। সূর্যের ব্যাস চাঁদের ব্যাসের ৪০০ গুণ এবং পৃথিবী থেকে সূর্যের দূরত্ব পৃথিবী-চাঁদের দূরত্বের ৪০০ গুণ। আবার অন্যদিকে, পৃথিবী থেকে এ দুই জ্যোতিষ্কের দূরত্ব তাদের নিজস্ব ব্যাসের ঠিক ১০৮ গুণ। প্রকৃতির এ খেয়ালের জন্য আমরা সূর্য ও চাঁদকে (পূর্নিমার চাঁদ) একই মাপের চাকতি রূপে দেখে থাকি, যদিও এদের আসল আয়তনে আকাশপাতাল তফাত। এ কারণেই চাঁদ যখন সূর্য থেকে ৪০০ গুণ পৃথিবীর কাছে অবস্থান করে সেই সময়ই চাঁদ ও সূর্যের চাকতির আকৃতি প্রায় সমান সমান হয়ে থাকে এবং চাঁদের চাকতি সূর্যকে সম্পূর্ণ গ্রাস করে পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণ ঘটায়।




পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণ কেবলমাত্র পৃথিবীর কয়েকটি অঞ্চল থেকেই দেখা সম্ভব। যেসব অঞ্চলে চাঁদের ছায়া বিস্তার লাভ করে কেবলমাত্র যেসব অঞ্চলই পূর্ণগ্রাস গ্রহণ দেখে যায়। এ ছায়ার ভিতরের অপেক্ষাকৃত গাঢ় অংশটিকে বলা হয় ‘প্রচ্ছায়া’ বা ‘আম্বরা’ (.Umbra.) এ প্রচ্ছায়া অঞ্চলটি ১৬০ কি.মি. ব্যাপী প্রসারিত হতে পারে। এ অঞ্চলের পর্যবেক্ষকরাই কেবল পূর্ণগ্রাস সূর্য গ্রহণ দেখে থাকে। ছায়ার বাইরের অপেক্ষাকৃত কম গাঢ় অংশটিকে বলা হয় ‘উপচ্ছায়া’ বা ‘পেনাম্বরা’ (.Penumbra.)।

খণ্ডগ্রাস সূর্যগ্রহণ
পূর্ণগ্রাসের সংকীর্ণ পথের বহির্ভাগে কিন্তু হালকা ছায়াযুক্ত বাইরের অঞ্চলের মধ্যে বা উপচ্ছায়া অঞ্চলের পর্যবেক্ষকরা খণ্ডগ্রাস সূর্যগ্রহণ(Partial Eclipse) দেখে থাকে। যদিও খণ্ডগ্রাস সূর্যগ্রহণ পূর্ণগ্রাসের মত চমকপ্রদ হয় না, তবুও এটি একটি যথেষ্ট অভূতপূর্ব দৃশ্য। এ সময় সূর্যেকে দেখলে মনে হয় তার কিছুটা অংশ যেন কামড়ে নেওয়া হযেছে। যখন চাঁদ সূর্যের চাকতি বা বলয়ের কিছুটা অংশ অতিক্রম করে থাকে।

বলয়গ্রাস সূর্যগ্রহণ
বলয়গ্রাস গ্রহণ তখনই ঘটে থাকে যখন চাঁদ সূর্যেও বলয়ের বা চাকতির পুরো অংশ ঢেকে দিতে পারে না এবং চাঁদেও চারপাশে একটা উজ্জ্বল আলোক বলয় আংটির মত দৃশ্যমান হয়ে থাকে। এ ঘটনাটি ঘটে যখন চাঁদ পৃথিবীর সর্বাপেক্ষা দূরে এবং পৃথিবী সূর্যের নিকটতম স্থানে অবস্থান করে থাকে। এর ফলে চাঁদ সূর্যকে পুরোপুরি ঢেকে দিতে পারে না। এভাবে পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণের বদলে বলয়গ্রাস সূর্যগ্রহণ (Annular Eclipse) হয়ে থাকে। বলয়গ্রাস সূর্যগ্রহণের একটি হতাশাজনক প্রভাব সৃষ্টি করে থাকে, কারণ সূর্যের করোনা এ গ্রহণের সময় পর্যবেক্ষণ করা যায় না।
 সূর্যগ্রহণ: সূর্য সম্বন্ধে গবেষণা
জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা সূর্যগ্রহণ সম্বন্ধে গবেষণার মাধ্যমে অনেক কিছু জানতে পেরেছেন। খালি চোখে বা পুরু কারো কাচের ভেতর দিয়ে দেখলে সূর্যকে একটা উজ্জ্বল থালা বলে মনে হয়। অন্য কোনো বিশেষত্ব বোঝা যায় না। টেলিস্কোপ দিয়ে দেখলেও তাই। কারণ সূর্যের উজ্জ্বলতা প্রধানত সে বৃত্তের মধ্যেই সীমায়িত, যার নাম ফোটোস্ফিয়ার বা আলোকমণ্ডল। কিন্তু ফটোস্ফিয়ারকে ঘিরে থাকা লাল রঙের আস্তরণ ক্রোমোস্ফিয়ার বা বর্ণমণ্ডল এবং ক্রোমোস্ফিয়ারকে ঘিরে থাকা গ্যাসের আস্তরণ করোনাকে সাধারণ দিনে আলাদা করে বোঝাই যায় না। এর কারণ, ফোটোস্ফিয়ারের উজ্জ্বলতা করোনার চেয়ে অন্তত ১০ লক্ষ গুণ বেশি। করোনাগ্রাফ নামে এক ধরনের টেলিস্কোপের সাহায্যে আলোকমণ্ডলকে কৃত্রিমভাবে আড়াল করে রাখা যায়। তা সত্ত্বেও আলোকমণ্ডলে আলো কোনো না কোনোভাবে নাক গলায় বলে করোনাকে পরিষ্কারভাবে চিহ্নিত করা যায় না।
করোনার যদি এরকম, অবস্থা হয় তা হলে বর্ণমণ্ডলের অবস্থা কী হবে, তা নিশ্চয়ই আর বলে দিতে হবে না। আসলে, কোনো ধরনের টেলিস্কোপ দিয়েই সাধারণ দিনে ক্রোমোস্ফিয়ারেকে বোঝা যায় না। কেবলমাত্র পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণের সময় একে কয়েক পলকের জন্য দেখা যায়। চাঁদ যখন ষূর্যকে ডুরোপুরি ঢেকে দেয়, ঠিক তার পর মুহূর্তে কয়েক সেকেন্ডের জন্য সরু লালচে রঙের বর্ণমণ্ডলকে চোখে পড়ে। এরপর যতক্ষণ পর্যন্ত সূর্য পুরোপুরি আবৃত থাকে ততক্ষণ ধরে দেখা যায় করোনার প্রকৃত রূপটা।
১৮৬০ সালের পূ্ণগ্রাস সূর্যগ্রহনের সময় দু’জন বিজ্ঞানী পি.এ.সাকচি ও ডব্লু দেলা রু প্রমাণ করে দেখান যে, ছটামন্ডল বা করোনা এবং বর্ণমন্ডলবা ক্রোমোস্ফিয়ার সূর্যেরই ভিন্নধর্মী অংশ। উজ্জ্বলতায় টেক্কা দিলে কি হবে, আলোকমন্ডল বা ফটোস্ফিয়ারের উষ্ণতা ৬০০০ ডিগ্রি কেলভিনের মতো। অথচ, করোনর তাপমাত্রা কয়েক লক্ষ ডিগ্রি। করোনার বর্ণালি বিশ্লেষণ করলে কয়েকটি বিকিরণ রেখা সুস্পষ্টভাবে আলাদা করে দেখা যায়। আমাদের চেনা কোন মৌলিক পদার্থের বর্ণালির সাথে এ রেখা মিলে না। তাই বহুদিন থেকে এটি ধরে নেয়া হয়েছিল যে, সূর্যে একটি পৃথক পদার্থের অস্তিত্ব রয়েছে যার জন্য ছটামন্ডলের বর্ণালিতে অচেনা রেখা দেখা যায়। এর নামও দেয়া হয়েছিল ‘করোনিয়াম’। কিন্তু ১৯৪১ সালে পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহনকালে বজ্ঞানী বি. এডলে বুঝতে পারলেন, সে বিকিরণ রখার জন্য দায়ী আমাদের চির পরিচিত লোহা নামক ধাতবটি। কিন্তু অকল্পনীয় উত্তাপে তার প্রতিটি পরমাণু থেকে ১৩টি করে ইলেকট্রন ছিটকে বেরিয়ে যায়। ফলে মৌলিক পদার্থ লোহা শুধুমাত্র গ্যাসীয় অবস্থায় পরিণত হয় না, ধনাত্মক তড়িৎযুক্ত হয়ে অবস্থান করে। লোহার এ অবস্থাটা জানতে পারা গিয়েছিল বলে করোনর কয়ক লক্ষ ডিগ্রি তাপমাত্রা সমন্ধে নিশ্চিত হওয়া গিয়েছিল।

 ১৯৮০ সালের সূর্যগ্রহনের সময় আমেরিকর ন্যাশনল সায়েন্স ফাউন্ডেশন এর বিজ্ঞানী সি.কেলার জেট বিমানে চেপে চাঁদর প্রচ্ছায়া অনুসরণ করেন। ফলে ৭ মিনিট ধরে তিনি ভরত মহাসাগরের আকাশ থেকে পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহন পর্যবেক্ষণ করতে পেরেছিলেন। তার দৃষ্টি ছিল প্রধাণত করোনার লেলিহান অগ্নিশিখার উপর। সূর্যের ব্যাসার্ধ যত, তার প্রায় ২০ গুণ দুরত্ব পর্যন্ত করোনার এ অগ্নিশিখাকে ছড়িয়ে পড়তে দেখা গিয়েছিল। এছাড়াও সূর্যের পশ্চিমপ্রান্তে একটি বিশাল সরশিখার উদগিরণ সে সময়ের মধেই তার টেলিস্কোপের ক্যামেরায় ধরা পড়েছিল।সৌরশিখার এ উদগিরণের সময় সূর্য থেকে আা বেতার তরঙ্গের আলোড়ন সৃষ্টি হয়। বেতার তরঙ্গের এ আলোড়ন লক্ষ করেও সৌরশিখার হটাৎ উৎপত্তির বিষয়ে সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায়।

 
শেষ কথা
তারার শ্রেণীবিন্যাস করার একটি সুনির্দিষ্ট পদ্ধতি রয়েছে, যা অনুসারে সূর্য G-2V বর্ণালি শ্রেণীর মধ্যে পড়ে। বর্ণালি ধরণ G-2 বলে দেয় সূর্যপৃষ্ঠের তাপমাত্রা আনুমানিক ৫৭৭৮ কেলভিন, আর ‘V’ দ্বারা বোঝায় যে আকাশগঙ্গার অধিকাংশ তারার মত সূর্যও একটি প্রধাণ ধারার তারা অর্থাৎ সে কেন্দ্রভাগে নিউক্লিয়ার সংযোজন বিক্রিয়ার মাধ্যমে অবিরাম হাইড্রোজেন পুড়িয়ে হিলিয়ম উৎপাদন করে যাচ্ছে। কিন্তু যাই হোক, সূর্যের জন্যই আমরা বেঁচে আছি। আলো দিয়ে তাপ দিয়ে সূর্য আাদের জীবনীশক্তি যোগাচ্ছে। গাছেরা সবুজ পাতায় তাদের খাদ্য তৈরী করে সূর্যেরই আলোর সাহায্যে, আমরা তার উপর ভাগ বসাই। কয়লা পুড়িয়ে যে শক্তি পাওয়া যায় তাও আসে সূর্যেরই কৃপায়।পাশাপাশি জলবায়ু এবং আবহওয়া নিয়ন্ত্রণেও সূ্র্যালোক প্রধাণ ভূমিকা রাখে। সূর্যের আলো যদি না থাকত, তাপ যদি না থাকত, তাহলে কোন জীবের পক্ষেই পৃথিবীতে বেচেঁ থাকা সম্ভব হতো না। তাই, আমাদর অস্তিত্বের জন্য আমরা সূর্যের নিকট ঋণী।

তথ্যসূত্র:

জ্যোতির্বিদ্যা - কালীপদ দাশ
মহাকাশের কথা - ফারসীম মান্নান মোহাম্মদী
এনসাক্লোপিডিয়া অব দ্যা ওয়ার্ল্ড(মহাবিশ্ব, গ্রহ, নক্ষত্র) - এ.এস.এম ভূঁইঞা শিহাব
http://www.onushilon.org/ (সূর্য)
মহাকাশ বিজ্ঞান - মোস্তাক আহমেদ
সৌরজগৎ - অনিন্দ্য দাস

সৌরজগৎ অধীশ্বর ( ১ম পর্ব )

আমাদের সৌরজগতের অধীশ্বর সূর্য একটি নক্ষত্র। যুগযুগান্তর ধরে মানুষের সব আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু হলো সূর্য। জ্ঞানোন্মেষের সঙ্গে সঙ্গে প্রাচীন মানুষ অনন্ত বিস্ময়ে দেখল, রাত্রিশেষে পুবের আকাশ ক্রমশ লাল হয়ে ওঠে, আর প্রকৃতির বৃক থেকে অন্ধকারের কালো আবরণ ধীরে ধীরে সরে যায়। একটু পরেই লাল রঙের থালার মত সূর্য তার অপূর্ব বর্ণচ্ছটায় চারদিক উদ্ভাসিত করে তোলে। সঙ্গে সঙ্গে নিস্তব্ধ পৃথিবীর বুকে জেগে ওঠে প্রাণের সাড়া, চতুর্দিক পাখির কাকলিতে মুখরিত হয়ে ওঠে। অন্ধকার থেকে আলোর প্রকাশ, যা থেকে এক মুহুর্তে পৃথিবীর সবকিছুই সুন্দর ও প্রাণজঞ্চল হয়ে ওঠা এবং তা দেখে সাধারণ মানুষের অপার বিস্ময় ও অপূর্ব পুলকের সঞ্চার খুবই স্বাভাবিক। তাই, হিন্দু শাস্ত্রানুসারে সত্য ও সুন্দরের ধ্যাণে মগ্ন হওয়ার এটাই সবচেয়ে যথার্থ সময়।
আমাদের সবচেয়ে কাছের তারা সূর্য আসলে একটি জ্বলন্ত গ্যাসের পিণ্ড। এটি পৃথিবীর ব্যাসের ১০৯ গুণ বেশি এবং ভর সৌরজগতের সব গ্রহের মিলিত ভরের ৭৪৫ গুণ অধিক। পৃথিবী থেকে সূর্যের গড় দূরত্ব ১৫২,১০০,০০০ কি.মি.। সূর্যের কোথাও কঠিন বা তরল পদার্থের অস্তিত্ব নেই। সূর্য আমাদের সৌরজগতের কেন্দ্রবিন্দু। বাসভূমি পৃথিবীসহ আরো সাতটি গ্রহ এই মহান তারাটিকে কেন্দ্র করে আবর্তন করছে। সূর্যই আমাদের সকল শক্তির উৎস। আমাদের জগৎ জীবন সবকিছু এই দেবতাতুল্য বস্তুটির উপর নির্ভরশীল। 
 সূর্যের উৎপত্তি
বিগব্যাঙের পরে আজ হতে প্রায় ১৩৬০ কোটি বছর পূর্বে জন্ম নেয় আকাশগঙ্গা নামক একটি গ্যালাক্সি, যার কেন্দ্র থেকে ২৫০০০ আলকবর্ষ দূরে কালপুরুষ নামক বাহুতে ৫০০ কোটি বছর আগে বিশাল সুপারনোভা বিস্ফরণজাত গ্যাসের মেঘ থেকেই আমাদের সূর্যের জন্ম। মহাকাশে নক্ষত্রদের মাঝে থাকে বিশাল ব্যাপ্তি। এই ফাঁকা স্থানে থাকে অসংখ্য ধুলিকণা, হাইড্রোজেন, হিলিয়াম ইত্যাদি।
কোনভাবে এই গ্যাসের মেঘ খুব ছোট জায়গায় ঘন হতে থাকে। ঠিক কিভাবে এই প্রক্রিয়া শুরু হয়, সে ব্যাপারে জেমস্ জীনসের তত্ত্ব কিছুটা সাহারয্য করে। যখন মেঘটি মহাকর্ষীয় পতনের শিকার হয়, তখনই সেই মেঘ থেকে সূর্যের জন্ম সূচিত হয়। আদি মেঘটিকে অবশ্যই ঘূর্ণায়মান হতে হবে। এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রে তাই ঘটে। ৫০০ কোটি বছর পূর্বে কোন এক অতীতে এরকমই কোন গ্যাসের মেঘ মহাকর্ষ পতনের ফলে ঘূর্ণায়মান হয়ে উঠেছিল। সেই আদি মেঘের যদি কোন চৌম্বকক্ষেত্র থাকে তবে কেন্দ্রেই তা শক্তিশালী হবে। কারণ, সেখানে ভর বেশী। এভাবেই সেই গ্যাসীয় মেঘের কেন্দ্রে তৈরী হয়েছিল আমাদের নতুন সূর্য, যাকে বলা হয় ভ্রূণ সূর্য। তারপর এই ভ্রূণ সূর্যের তাপমাত্রা বাড়তে থাকে। এভাবে অভ্যন্তরীণ তাপমাত্রা কোটি ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়ে গেলে হাইড্রোজেন পরমাণুর নিউক্লিয়াসর প্রোটনগুলোর মধ্যে সংঘর্ষ সৃষ্টি হয়। বিকর্ষণজনিত যে বৈদ্যুতিক বল প্রোটনগুলোকে বিচ্ছিন্ন রাখে, এই প্রচন্ড তাপশক্তি তা উপেক্ষা করে প্রোটনগুলোর মধ্যে সংঘর্ষ বাঁধিয়ে দেয়। সংঘর্ষজনিত এ বলের প্রভাবে হাইড্রোজেন পরমাণুগুলো গলে গিয়ে তৈরী করে হিলিয়াম। এভাবেই নিউক্লিয়ার বিক্রিয়ায় সূর্যের চুল্লীতে দহন প্রক্রিয়া শুরু হয়। আরো দু’কোটি বছর পর আমাদের সূ্র্য দৃঢ় স্থির অবস্থায় উন্নীত হয়। নিউক্লিয়র বিক্রিয়ায় উদ্ভূত তাপের ফলে সৃষ্ট বহির্মুখী চাপ এবং মহাকর্ষজনিত অন্তর্মুখী টানের ফলে সাম্যাবস্থার সৃষ্টি হয়। পরবর্তী পাঁচশ কোটি বছর ধরে এখন পর্যন্ত আমাদের সূ্র্য এমনিভাবেই জ্বলছে এবং আরো পাঁচশ কোটি বছর জ্বলবে। 
 পুরো আকাশগঙ্গা ছায়াপথ নিজে আবর্তিত হচ্ছে। সে কারণে, সূর্যও নির্দিষ্ট গতিতে ছায়াপথের কেন্দ্র অনুসরণ করে ঘুরছে।এক্ষেত্রে সৌরজগতের ঘূর্ণায়মান গতি প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ২১৭ বছর। এ গতিতে সৌরজগৎ একবার সম্পূর্ণ আবর্তিত হতে সময় নেয় ২২৬,০০০,০০০ বছর। সূর্যের ব্যাস ১৩,৯১,১০৭ কি.মি. যা পৃথিবীর ব্যাসের ১১০ গুণ। এ থেকে পাওয়া যায় সূর্য পৃষ্ঠের ক্ষেত্রফল পৃথিবীপৃষ্ঠের ক্ষেত্রফলের ১২,০০০ গুণ এবং সূর্যের আয়তন পৃথিবীর আয়তনের ১৩ লক্ষ গুণ। আকারে বিশাল হলেও সূর্যে পদার্থের ঘনত্ব ১/৪ ভাগ, ফলে সূর্যের ভর পৃথিবীর ভরের ৩,৩০,০০০ গুণ, ২০৬০কি.গ্রা.। বিশাল ভরের দরুণ এর মহাকর্ষ বল পৃথিবীর চেয়ে অনেক বেশী, ২৭.৯ গুণ। পৃথিবী থেকে সূর্যের দূরত্ব ১৪ কোটি ৯৫ লক্ষ কি.মি.। সূর্য হতে এ বিশাল দূরত্বে পৃথিবীর অবস্থান হলেও সূর্যের প্রবল মহাকর্ষের টান পৃথিবীকে তার কক্ষপথে ধরে রেখেছে। 

 সূর্যের উপাদান
সূযের বহিস্তর ৭৩% হাইড্রোজেন, ২৫% হিলিয়াম, ২% অন্যান্য উপাদান দ্বারা গঠিত। কিন্তু যেখানে ৬০০০ লক্ষ টনেরও অধিক হাইড্রোজেন হিলিয়ামে পরিণত হয়ে চলছে প্রতিমুহূর্তে সেখানে হাইড্রোজেনের পরিমাণ প্রায় ৩৪% এবং হিলিয়ামি প্রায় ৬৪%। সূর্যেও কেন্দ্রীয় অংশে এভাবে হাইড্রোজেন, হিলিয়ামে রূপান্তরের ফলে শক্তি সৃষ্টি হচ্ছে। প্রসঙ্গত চারটি হাইড্রোজেন পরমানু (প্রোটন) মিলে একটি হিলিয়াম পরমাণু সুষ্টি হরছে। এ ছাড়া গামা রশ্মি নামক একগুচ্ছ বিকিরিত রশ্মি বা আলোককণার সঙ্গে পজিট্রন (.Positron.) ও নিউট্রিনো (.Neutrino.) নামক কণিকাও এ সময় নির্গত হয়। এ রূপান্তরের সময় শতকরা ০.০৭ ভাগ ভর শক্তিতে রূপান্তরিত হয়। ফলে প্রতি মুহূর্তে বিপুল পরিমাণে শক্তি ও উত্তাপ সৃষ্টি হচ্ছে।
এ শক্তি সূর্যের কেন্দ্র থেকে বাইরের দিকে রওনা হয় গামা ও রঞ্জন রশ্মি রূপে। কেন্দ্রের প্রচণ্ড চাপের ফলে একবিন্দু শক্তির বাইরের দিকে আসতে প্রায় দশ থেকে কুড়ি লক্ষ বছর সময় লাগে। সূর্যেও পৃষ্ঠদেশ থেকে এ আলোকশক্তি পৃথিবীতে পৌঁছাতে সময় লাগে মাত্র ৮.৩ মিনিট।
ক্রমাগত সূর্যেও কেন্দ্রে এ তেজস্ক্রিয় বিক্রিয়ার ফলে যখন হাইড্রোজেনের পরিমাণ কমে আসবে তখন কিন্তু বিরাট সমস্যার সৃষ্টি হবে। কেন্দ্র তখন শুকিয়ে ছোট হয়ে আসবে ১/১০ ভাগ আগের আয়তনের তুলনায়। বাইরের স্তরগুলো উঠবে ফুলে। তাদের তাপমাত্রা অনেকখানি কমে আসবে এবং সূর্য পরিণত হবে লাল দানবে (.Red Giant.)। আরো হাজার কোটি বছর পরে যখন সূর্য লাল দানবে পরিণত হবে তখন তার উজ্জ্বলতা বর্তমানে তুলনায় দ্বিগুণ বৃদ্ধি পাবে। এ অবস্থায় তার ব্যাস প্রায় বর্তমানের তুলনায় ১০০ গুণ বৃদ্ধি পাবে। এর ফলে সূর্যের কাছে অবস্তিতত গ্রহগুলোর ধ্বংস অনিবার্য হয়ে উঠবে। সম্ভবত এ অবস্থায় সূর্য বুধ, শুক্র ও পৃথিবীকে গ্রাস কওে মঙ্গলে এসে উপস্থিত হবে। অবশ্য এ ঘটনা নিয়ে এখনই চিন্তা করার কোনো কারণ নেই। কেন না, সূর্য তার হাইড্রোজেন জ্বালানির শতকরা একভাগ মাত্র এ পর্যন্ত খরচ করেছে। এমন ঘটনা ঘটবে ৫০০ কোটি বছর পর।

সূর্যের গঠন
সূর্যের গোটা শরীরটা এক ধরণের নয়। সূর্যকে গঠনের বৈচিত্র্য অনুযায়ী তিনটি অংশে ভাগ করা যেতে পারে, যথা- কেন্দ্রমন্ডল(Center Zone), মধ্যাঞ্চল(Interior), পরিচালন মন্ডল(Convection Zone), আবাহমন্ডল(Solar Atmosphere). আবাহমন্ডলকে আবার চার ভাগে ভাগ করা যায়। যথা- আলোকমন্ডল(Photosphere), স্বল্প তাপমাত্রা অঞ্চল (Temperature minimum), বর্ণমন্ডল(Chromosphere) ও ছটামন্ডল(Corona)। 
পৃথিবীতে বায়ুমণ্ডল আছে আমরা জানি। সূর্যের চারদিকে তেমনই আছে একটা গ্যাসের আবরণ, এ আবরণটি কম ঘনত্বের গ্যাসের দ্বারা আবৃত।
ক্রোমোস্ফিয়ারের উপরে এবং মহাশূন্যে লক্ষ লক্ষ কি.মি. ব্যাপী ¯বিস্তৃত অঞ্চল হলো এ করোনা। এটি সূর্যের আবহমন্ডলের সবচেয়ে বাইরের অংশ। পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল ঠাণ্ডা বলে নিস্প্রভ। সূর্যের অপাবরণটি অত্যন্ত উত্তপ্ত। মনে হয় সর্বদাই জ্বলছে। এ অংশের তাপমাত্রা প্রায় ১০ লক্ষ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড। তবে কখনো কখনো এ অঞ্চলটিতে তাপমাত্রা বৃদ্ধি পেয়ে ৩০ লক্ষ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেডের উপরেও উঠে যায়। এত তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাওয়া সত্ত্বেও করোনার উজ্জ্বলতা খুম কম। এর কারণ হলো এ অঞ্চলের গ্যাসীয় স্তর খুবই পাতলা। এর বিস্তৃতি প্রায় ৩.৬ কোটি মাইল, বুধগ্রহের কাছাকাছি পর্যন্ত।
সূর্যের এ করোনা অংশ থেকে প্রবাহমান আলোকের উচ্চগতিসম্পন্ন কণিকাসমূহকে বলা হয় সৌর বাতাস বা সোলার উইন্ড (.Solar Wind.)। এটা ইলেকট্রন ও প্রোটন কণিকা ছাড়াও আরও নানা প্রকার কণিকা দ্বারা গঠিত এবং এগুলো চৌম্বকক্ষেত্র ও তড়িৎপ্রবাহ সৃষ্টি করে থাকে। এটি হেলিয়োস্ফিয়ার (.Heliosphere.) নামক একটি অঞ্চলকে প্রভাবিত করে থাকে, যার ¯বিস্তৃতি সূর্য থেকে ১৫ বিলিয়ন কিলোমিটার। সৌরবাতাস প্রতি সেকেন্ডে ৩০০-৮০০ কিলোমিটার বেগে পৃথিবীর ওপর দিয়ে বয়ে যায। মাঝেমধ্যে কোটি টন গ্যাসের তৈরি বুদবুদ করোনা থেকে বিস্ফোরিত হয়ে কম্পন তরঙ্গের মাধ্যমে সৌরবাতাসে প্রেরিত হয়। পৃথিবীর চৌম্বকক্ষেত্র সৌরবাতাসের অনেকটাই শনাক্ত করতে পেরেছে।
পৃথিবীর উত্তর ও দক্ষিণ মেরুদেশীয় অঞ্চলে আমরা সে মেরুজ্যোতি বা আরোরা (.Aurora.) দেখতে পাই তার প্রধান কারণ হলো এ সৌরবাতাস। আরোরা বা মেরুজ্যোতি দেখা যায় যখন সৌরবাতাস কণিকাসমূহ পৃথিবীর চৌম্বকীয় ক্ষেত্রে আবদ্ধ হয়ে যায় এবং বায়ুমণ্ডলের উচ্চ অংশ বাতাসের অনুগুলোর সঙ্গে আবদ্ধ হয়। মেরুজ্যোতি মেরুপ্রদেশের আকাশে প্রদর্শিত হয় বিভিন্ন প্রকার রঙিন আলোকের এক অপররূপ প্রদর্শনী।
করোনার ভেতর দিকে অর্থাৎ দ্বিতীয় স্তরে রযেছে ফোটোস্ফিয়ার, বা আলোকমণ্ডল। সূর্যের আলোকমণ্ডল বলতে বোঝায় আমরা খালি চোখে সূর্যের যে অতি উজ্জ্বল আলোকময় অংশ দেখতে পাই সেটা। এ আলোকমণ্ডলে গ্যাসীয় বায়ুর ঘনত্ব খুবই কম। ৫০০ কিলোমিটার পুরু আলোকমণ্ডলের ভেতর থেকে অস্বচ্ছ, উত্তপ্ত জ্বলন্ত গ্যাস উঠে এস বাইরে মিলিয়ে যাচ্ছে। এর কেন্দ্রের ঘনত্ব পানির ৯০ গুণ আর লোহার ১২ গুণ। গ্যাসীয় বস্তু সেখানে ইস্পাতের মত কঠিন অবস্থায় রয়েছে। এ আলোকণ্ডলের তাপমাত্রা নিচ থেকে উপরে ক্রমশ হ্রাস পায়। এখানকার অংশে তাপমাত্র ৮৫০০০ সেন্টিগ্রেড থেকে হ্রাস পেয়ে উপরি অংশে তাপমাত্রা ৪২০০০ সেন্টিগ্রেডে এসে পৌঁছায়। তবে আলোকমণ্ডলে গড় তাপমাত্রা প্রায় ৫৫০০০ সেন্টিগ্রেড। দুপুরের রোধে দাঁড়ালে আমাদের গায়ে তাপ লাগে। তা হলেই বোঝা যাচ্ছে সূর্যের তাপটা কত ভয়ঙ্কর। আকাশে জ্বলন্ত সূর্য থেকে যে তাপ ছড়িয়ে পড়েছে, তার ২৩ কোটি ভাগের ১ ভাগ মাত্র আমাদের পৃথিবীতে এসে পৌঁছায়। তাতেই এত তাপ। সারা পৃথিবীতে সূর্য থেকে একসঙ্গে যে তাপ এসে পৌঁছায় তা একত্রে জমা করতে পারলে এক মিনিটের মধ্যেই দশ লক্ষ মণ পানি ফুটে উঠত বলে বিজ্ঞানীদের অনুমান।
সূর্যের উপরিতল বা আলোকমণ্ডল জটিল কম্পনের আকৃতি অনুযায়ী ওঠানামা করে, একে বলা হয়, সোলার অসিলেশনস (.Solar Ocillations.)। কম্পন বা অসিলেশনের বেশিরভাগই হয়ে থাকে শব্দ কম্পনের জন্য যা উৎপন্ন হয় কনভেকটিভ জোন (.Convective Zone.) এর নিচে এবং সূর্যের অভ্যন্তরেই আবদ্ধ তেকে যায়। বিজ্ঞানীরা মনোযোগ সহকারে আলোকমণ্ডলের এ কম্পনের গঠন প্রকৃতির মানচিত্র অঙ্কনের মাধ্যমে সূর্যের অভ্যন্তরীণ গঠন সম্পর্কে জানতে পারেন।
কিছু কিছু সোলার অসিলেশনস আবার ‘সান কয়েকস’ (.Sunquakes.) বা সৌর কম্পন-এর ফলেও হতে পারে। এ কম্পন তরঙ্গগুলো ছড়িয়ে পড়ে সূর্যের অশান্ত উত্তপ্ত গ্যাসের প্রান্ত থেকে যা কনভেকশন সেল (.Convection Cell.) নামে পরিচিত। ১.২ বিলিয়ন টন উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন বিস্ফোরকের বিস্ফোরণের ফলে উৎপন্ন শক্তি এ কম্পন তরঙ্গের দ্বারা বাহিত শক্তির সমান হয়ে থাকে।
আলোকমণ্ডলের উপর কালো কালো অনেকগুলো দাগ ও জায়গা রয়েছে। এ দাগগুলো পৃথিবী থেকে সাধারণ দূরবীন (তবে, কখনোই ফিলটার ছাড়া খালি দূরবীনের মাধ্যমে নয়) দিয়েও দেখা যায়। এগুলোকে কালো দেখাবার কারণ আশোপাশের এলাকাগুলোর তাপমাত্রা কিছুটা কম এবং এগুলো উজ্জ্বল বেষ্টনী দ্বারা আবদ্ধ। তবে এরা কিন্তু স্থির থাকে না। সূর্যদেহের ওপর চলে ফিরে বেড়ায়। এদের নাম সৌর কলঙ্ক (.Sunspot.)। এ কলঙ্কগুলো দুটি শ্রেণীযুক্ত হয়। এর মধ্যে যেগুলো ছোট দাগযুক্ত অঞ্চল যা প্রায় ১০০০ কিলোমিটারেরও কম অঞ্চল জুড়ে ¯বিস্তৃত সেগুলো ‘’পোরস্’’ (.Pores.) নামে পরিচিত। আবার যেগুলো একসঙ্গে অনেকগুলো সমষ্টিবদ্ধভাবে রয়েছে তাদের বলা হয় সানস্পট গ্রুপ (.Sunspot Group.)। এগুরো প্রায় ১ লক্ষ কিলোমিটার ব্যাপী বিস্তৃত হয়ে থাকে।
 এ সৌর কলঙ্কের উৎপত্তি নিয়ে নানারকম মত আছে। যেমন-অনেকে বলেন নিজের অক্ষের চারপাশে সূর্যের যে গতিবেগ, সূর্যের দেহের সর্বত্র তা সমান নয়। নিরক্ক্ষরেখার ওপরের অংশে একবার ঘুরতে সময় লাগে ২৪ দিন ১৬ ঘণ্টা, চল্লিশ ডিগ্রি উত্তর বা দক্ষিণ অক্ষাংশে এ সময় লাগে ২৭ দিন আর মেরু অঞ্চলে এ ঘূর্ণনের সময় লাগে আরো বেশি অর্থাৎ প্রায় ৩৫ দিন। সূর্য যে ঘনীভূত পদার্থ নয়, উত্তপ্ত গ্যাসীয় বস্তু, এ থেকেই তা সহজে বোঝা যায়। ফলে সূর্যের গ্যাসীয় এ বস্তুর মধ্যে এক বিপুল আলোড়নের সৃষ্টি হয়। এ আলোড়নের ফলে সূর্যের নিজস্ব চৌম্বক ক্ষেত্রে নানা পরিবর্তন ঘটে, যার প্রকাশ এ সৌরকলঙ্কগুলো।
সূর্যের আলোকমন্ডলে খুব বেশি তাপের ফলে জ্বলন্ত বাষ্প অতি দ্রুতবেগে ধাবিত হয়ে প্রবল ঝড়ঝঞ্ঝা বাড়িয়ে দেয়। এর ফলে সূর্যের আলোকমণ্ডলের আগুনে বাষ্পের কিছু অংশ এদিক ওদিক ছড়িয়ে পড়ে। বিস্ফোরণের ফলে এটা ঘটে বলে ধারণা করা হয়। আলোকমন্ডলের ফাঁক দিয়ে তখন সূর্যের সে ছটায় কালো কালো দাগ ফুটে ওঠে। একালো দাগগুলো সর্বোচ্চ ৮০০০ কি.মি. পর্যন্ত বিস্তৃত হতে দেখা যায়, এর কেন্দ্রের গভীর কলো অংশকে বলা হয় প্রচ্ছায়া(Umbra) আর একে ঘিরে যে হাল্কা ছায়া দেখা যায় তকে বলে উপচ্ছায়া(Penumbra)।এদের কতকগুলো আবার বিরাট বিরাট গর্তের সৃষ্টি করে। গর্তগুলো এত বড় যে তা দু-তিনটে পৃথিবীর সমান। তবে এরা বেশিদিন স্থায়ী হয় না। কোনোটি স্থায়ী হয় কয়েকদিন মাত্র আবার কোনোটা কয়েকমাস স্থায়ী হয়ে থাকে। সৌরকলঙ্কগুলো পূর্ব থেকে পশ্চিম দিকে সরে যেতে থাকে। নিরক্ষবৃত্তের কাছে সূর্যেও যে বহুদিন স্থায়ী সৌরকলঙ্ক রয়েছে তা পূর্বদিক থেকে সরে সরে পশ্চিমদিকে অদৃশ্য হয়ে গেলেও কিছুদিন পরে আবার তাকে পূর্ব প্রান্তেও দিকে দেখা যায়। প্রতি মাসে সর্বোচ্চ প্রায় ১২০টি সৌরকলঙ্ক সূর্যপৃষ্ঠে দেখা যায়। এ সংখ্যা সর্বনিম্ন প্রায় ৬টিতে নামতে পারে।
 সৌরকলঙ্কের সংখ্যা যে বছর বৃদ্ধি পায় তখন কিন্তু পৃথিবীতে গ্রীষ্মের তীব্রতা বেড়ে যায়। বায়ুমণ্ডলের সবচেয়ে ওপরের স্তর তড়িৎভাবাপন্ন হয় আর ভূপৃষ্ঠে চুম্বক ঝড়ের প্রকাশ দেখা যায়। এর ফলে টেলিগ্রাফ, বিদ্যুৎ সরবরাহ, বেতার বার্তা প্রেরণ প্রভৃতির কাজেও মাঝে মাঝে ব্যাঘাত ঘটে থাকে।সৌরকলঙ্কের সংখ্যা যেবছর বৃদ্ধি পায় সে বছর সৌর শিখা বা সোলার ফ্লেয়ার (.Solar Flare.) এবং সৌর ঝড় এর দাপট বৃদ্ধি পায়।
১৮৫৯ সালে দুই বিজ্ঞানী রিচার্ড সি ক্যারিংটন ও রিচার্ড হাজসন সোলার ফ্লেয়ার বা সৌরশিখার কোঁজ পান। কিন্তু কেন হয় এ সৌরঝড় ও সৌরশিখা? সূর্যেও আবহমণ্ডল বা তার চারদিকেও গ্যাসীয় পর্দার পাশে জমে ওঠা চৌম্বকশক্তি হঠাৎ করেই ছিটকে বেরিয়ে আসে। এর ফলে যে বিকিরণ হয় তার শক্তি বা ক্ষমতাও সাধারণের কল্পনার বাইরে কয়েক লক্ষ মেগাটন হাইড্রোজেন বোমা বিস্ফোরণের সমতুল্য। সূর্য থেকে চৌম্বকমক্তি যত বিকিরিত হতে থাকে ততই অগুনতি ইলেকট্রন, প্রোটন আর ভারী নিউক্লিয়াস উত্তপ্ত হতে থাকে। ক্রমশ তাদের গতিবেগ বাড়তে বাড়তে এমন পর্যায়ে পৌঁছে যায় যে তা সূর্যের আবহমণ্ডলে ছিটাকে বেরিয়ে আসতে থাকে।


সান ফ্লেয়ার বা সৌরশিখা দেখতে পাওয়া যায় সৌর নিরক্ষরেখা করোনার ভিতর। সৌর নিরক্ষরেখার চারিধারে করোনা অনেকটা লুপ বা ফাঁসের মত, অংশটির নাম অ্যাক্টিভ রিজিয়ন। অ্যাক্টিভ রিজিয়ানের মধ্যেই সৌরশিখার অবস্থান। বিজ্ঞানীদের মতে সূর্যের মধ্যে চৌম্বক ক্ষেত্রে পরিবর্তন হলেই সৌরশিখার সৃষ্টি হয়। আবার সে অ্যাক্টিভ রিজিয়নেই ইলেকট্রিফায়েড ও ম্যাগনেটাইজড বা তড়িতাহত ও চৌম্বকাহত গ্যাস (প্লাজমা) রয়েছে। এগুলো খুব ভালো পরিবাহী। সে প্লাজমার ছিটকে বেরিয়ে আসার ঘটনার নাম ‘’করোনাল মাস ইজেকশান’’।


শনিবার, ১৯ জুলাই, ২০১৪

বিজ্ঞানশিক্ষা বনাম বিজ্ঞানমনস্কতা

বিজ্ঞানশিক্ষা কি জিনিস - সেটা আমরা সবাই জানি, কিন্তু বিজ্ঞানমনস্কতা কি - সেটা বোধহয় সবাই জানি না। তাই সে বিষয়ে আগে সূত্রপাত করা প্রয়োজন। বিজ্ঞানমনস্কতা হল সকল প্রাকৃতিক ঘটনার বৈজ্ঞানিক কারণ অনুসন্ধান করার মানসিকতা। এই জিনিসটা অবশ্যই সকল মানুষের মধ্যে Specially বিজ্ঞানের ছাত্রদের মধ্যে থাকা উচিত কিন্তু নাই। আজও আমরা অলৌকিক ঘটনায় বিশ্বাস করি, বোকার মত বিশ্বাস করি যে সবকিছুর বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা প্রদান করা মানুষের পক্ষে সম্ভব না। বিজ্ঞানমনস্ক হওয়ার প্রথম এবং প্রধান শর্ত হল এটা বিশ্বাস করা যে, ''জগতে কোনকিছুই অলৌকিক নয়, কোনকিছুই মানববুদ্ধির অগম্য না, সমস্ত প্রাকৃতিক ঘটনারই বৈজ্ঞানিক কারণ আছে। হয়ত আমরা এখনো সবকিছু আবিস্কার করতে পারি নাই, ভবিষ্যতে করব।'' আমাদের সামাজিক প্রেক্ষাপটে একদিকে বিজ্ঞানের ছাত্রটি কুসংস্কারাচ্ছান্ন,অপরদিকে সাহিত্যের ছাত্রটি মুক্তমনা-এমন দৃশ্যপট মোটেও ব্যতিক্রম নয়। অর্থাৎ একজন বিজ্ঞানের ছাত্র হলেই যে সে বিজ্ঞানমনস্ক হবে এমন কোন নিশ্চয়তা নেই। বরং নিউটন-আইনস্টাইন পড়েও একজন বিলক্ষণ যুক্তিহীন হয়ে গড়ে ওঠে, প্রাণীবিজ্ঞানের ছাত্র হয়েও একজন বিশ্বাস করেন ''বিবর্তনবাদ'' একটি ভুয়া মতবাদ-এমনটাই আমাদের দেশের স্বাভাবিক দৃশ্য। হুমায়ূণ আজাদের মত মানুষ বাংলা সাহিত্যের শিক্ষক হয়েও বিজ্ঞানমনস্কতার যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন আমাদের দেশের বিজ্ঞান ও প্রকৌশল শিক্ষার ছাত্র-শিক্ষকদের মাঝে ততখানি বিজ্ঞানমনস্কতা,কিংবা বিজ্ঞানমনস্কতাকে প্রতিষ্ঠিত করার সাহস কোনটাই খুব একটা দেখা যায় না। আমাদের প্রথম ও প্রধান মানসিক বৈকল্য হচ্ছে আমরা কোন কিছু জানার আগেই নির্দিষ্ট কিছু বিষয়ে বিশ্বাস স্থাপন করে ফেলি(বা ফেলানো হয়);এরপর যে যে বিষয় বস্তু ঐ ঐ বিশ্বাসের সাথে সাংঘর্ষিক সেগুলোকে আমরা অস্বীকার করি কিংবা অবাস্তব/অসম্ভব দাবি করি। অথচ এই দাবিটি করছিই আমরা একটি অযৌক্তিক কে ভিত্তি করে। সমস্যাটা হচ্ছে,আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা এই অযৌক্তিক কে নির্মূল করা তো দূরে থাক,প্রকারান্তে এই অবাস্তব assumptionকেই প্রতিষ্ঠিত করে মুক্তচিন্তার পথকে বাধাগ্রস্ত করছে। এক কথায় বিজ্ঞানের মূল উৎস যেখানে, ‘কি কেন এবং কিভাবে’ এই প্রশ্ন করা কিংবা কার্যকারণ অনুসন্ধান করা-এই বেসিক বিষয়ে বিস্মৃত রেখে আমাদেরকে বিজ্ঞান শিক্ষা দেয়া হচ্ছে।ফলে নিউটনের সূত্র টপাটপ গলধঃকরণ করে কিংবা পাঠ্যবইয়ের বাইরেও জ্ঞান আহরণ করার পরও আমাদের মধ্যে যুক্তিবোধ জাগ্রত হচ্ছে না।কারণ আমাদেরকে চিন্তা করানো শিখানোই হয়েছে ভুল একটা পদ্ধতিতে। ভুলভাবে চিন্তা করার প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে আমাদেরকে এই শিক্ষা ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে। বিজ্ঞান কি? আইনস্টাইনের জেনারেল থিওরি অব রিলেটিভিটি গুলে খাওয়া কিংবা ফ্লুইড মেকানিক্সের নেভিয়ার স্ট্রোক ইকুয়েশনে প্যাশনেট হওয়া কিংবা অয়লারের কঠিন গাণিতিক তত্ত্বে পারদর্শী হওয়াই কি বিজ্ঞান? আমি অনেক ফিজিক্স জানি,গণিতের পোকা-তাতেই কি আমার বিজ্ঞান শিক্ষা সার্থক হয়ে গেল? আমার উত্তর হচ্ছে না। বিজ্ঞান হচ্ছে একটা দর্শন,যে দর্শনের মূল ভিত্তিটাই হচ্ছে প্রশ্ন করা,কার্যকারণ অনুসন্ধান করা। সেই প্রশ্ন করা আর সত্যান্বেষণ করার চেতনা বা মানসিকতা যদি আমার মধ্যে তৈরি না হয় তবে হাজার হাজার বই পড়ে আমি হয়তো জ্ঞানী হতে পারবো কিন্তু বিজ্ঞানমনস্ক হতে পারবো না। আর বিজ্ঞান পড়ে যদি বিজ্ঞানমনস্কই হতে না পারি, তো কি লাভ এত জ্ঞানী হয়ে ? কি লাভ এত সার্টিফিকেট আর ডিগ্রি নিয়ে ? সমস্যাটা হল আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা এখন marks and money সিনড্রোমে ভুগছে- . লেখাপড়ার মূল উদ্দেশ্য ভাল নম্বর পাওয়া এবং শিক্ষাজীবন শেষে ভালো বেতনের চাকরি পেয়ে সুন্দরী বউ ঘরে তুলে সংসারী হওয়া-এটাই হচ্ছে ভেতো বাঙ্গালির কমন জীবন দর্শন,কিংবা আরেকটু বাড়িয়ে বলা যায়,এটিকেই বাঙ্গালি জীবনের সর্বোচ্চ সার্থকতা(মতান্তরে সাফল্য) হিসাবে বিশ্বাস করে। এই সমস্যার উদ্ভব আমাদের সমাজের প্রচলিত কিছু সংস্কার থেকে।ছোট থেকে আমাদের শেখানো হয় গুড বয় হতে।গুড বয়ের সংজ্ঞা কি? যে বিনা বাক্যব্যয়ে সব মেনে নেয়,কথার বিপরীতে পালটা যুক্তি দেয় না, এমনকি প্রতিবাদও করে না। প্রতিবাদ করাটা এক অর্থে আমাদের গুরুজনদের কাছে অভদ্রতার প্রতীক,রীতিমত যেন এক ঝামেলা। গায়ে কাদা না লাগিয়ে সাক্ষী গোপাল হিসেবে একটা কুপমন্ডূক জীবন কাটিয়ে দিতে পারলেই বাঙালি মহাখুশি। রবীন্দ্রনাথ বোধহয় এজন্যই বলেছিলেন-‘ইহার চেয়ে হতেম যদি আরব বেদুইন’!!! কিংবা নজরুলের শেষ ভাষণের এই বাক্যটির কথাই ধরা যাক-‘আমাকে বিদ্রোহী বলে খামোখা লোকের মনে ভয় ধরিয়ে দিয়েছেন কেউ কেউ। এই নিরীহ জাত টাকে আচড়ে কামড়ে তেড়ে নিয়ে বেড়াবার ইচ্ছা আমার কোনদিনই নেই। আমি বিদ্রোহ করেছি, বিদ্রোহের গান গেয়েছি অন্যায়ের বিরুদ্ধে, অত্যাচার এর বিরুদ্ধে।'' তিনি শুধু অন্যায়ের প্রতিবাদ করেন নি,প্রতিবাদ করেছিলেন এই সমাজব্যবস্থার বিরুদ্ধে,প্রশ্ন উত্থাপন করেছিলেন আমাদের ঘুনে ধরা প্রাচীন অর্বাচীন চিন্তা-ধারার বিরুদ্ধে।তাই তিনি হয়ে পড়লেন বেয়াদব,শয়তান, ‘শান্তি’ বিনষ্টকারী। এখন অবশ্য বাঙালি মুসলমানদের মধ্যে যারা অতি সাম্প্রদায়িক এবং ধর্মান্ধ তাদের কাছে নজরুলই হচ্ছেন একমাত্র যক্ষের ধন রবীন্দ্রনাথ নামক মালাউনের বিপরীতে!!!! এক মালাউনের লেখা গান কেন আমাদের জাতীয় সংগীত তা নিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী সাকা চৌধুরী জাতীয় সংসদে বসেই ব্যাপক আহাজারি করেছিলেন।তখন কিন্তু নেহায়েৎই শিক্ষিত শ্রেণীর কিছু সাহসী মানুষ ব্যতীত আপামত জনগোষ্ঠীর মধ্যে আহামরি কোন প্রতিক্রিয়া দেখা যায় নি,কারণ প্রতিক্রিয়া দেখানোটা আমাদের সমাজে অভদ্রতা,যদি সেটা হয়ে ধর্মান্ধতার বিরুদ্ধে তাহলে তো কথাই নেই। একারণে তথাকথিত নিরপেক্ষ বুদ্ধিজীবীগণ আর টকশো এর বুদ্ধিজীবীগণ তাদের দেশ উদ্ধারের বক্তৃতায় এ বিষয়গুলোতে নীরব থাকেন। ঈশ্বরচন্ত্র বিদ্যাসাগর সমাজ সংস্কারক, সাহিত্যের মানুষ, বিজ্ঞানী নন। অথচ তিনি গ্রামে গ্রামে স্কুল প্রতিষ্ঠা করে বিজ্ঞান শিক্ষা দিয়েছেন শিশুদের।শিখিয়েছে আহ্নিক গতি বার্ষিক গতির ব্যাপার স্যাপার। অকপটে বলেছেন কোন রথের চাকায় ভর করে সূর্য যাতায়াত করে না,বলেছেন সূর্য পৃথিবীর নিচে কোথাও গিয়ে চোখ বুজে ঘুমায় না। এই হচ্ছে বিজ্ঞান শিক্ষা,এই হচ্ছে বিজ্ঞানমনস্কতার সূচনা। এই কাজটি তিনি করেছিলেন কারণ তিনি বিজ্ঞানমনস্ক ছিলেন, যে বিজ্ঞানমনস্কতার ধার ধারেন না আমাদের ফিজিক্স কেমিস্ট্রি জুলজি বা প্রকৌশলীর শিক্ষকগণ। আমি একজন বিজ্ঞানমনস্ক ব্যাক্তি। এইজন্যই যখন দেখি যে, আমার কোন গণিত বা ফিজিক্সের শিক্ষক মানবজাতির উৎপত্তির ক্ষেত্রে সেই আদিপিতা-আদিমাতার গাঁজাখুরি থিওরীতে বিশ্বাস করে এবং আফসোস করে বলে, ''ইশ্, কেন যে তাহারা শয়তানের কথায় বেহেশ্তের ঐ বিশেষ ফল খেতে গিয়েছিল। তারা ঐ ভুলটা না করলে আমরা কত মজা করে স্বর্গে বসে স্বর্গীয় সুখ ভোগ করতাম; আমাদের এত কষ্ট করে ফিজিক্স ম্যাথ শিখতে হইত না, এত বাঘা বাঘা Equation জানতে হত না। সর্বোপরি পৃথিবীর মত কষ্টদায়ক জায়গাতে আসতে হইত না।'' তখন আমারই আফসোস হয় তেনাদের কথাবার্তা শুনে। মনে হয়, ''এ কাদের কাছে আমি পড়ছি, কাদের কাছ থেকে বিদ্যা অর্জন করছি ?'' বর্তমানকালের একজন জনপ্রিয় পদার্থবিজ্ঞানী ব্রায়ান গ্রীণ বলেছেন, ''আমার প্রকৃত শিক্ষক কখনোই তারা নয় যারা আমার সকল প্রশ্নের উত্তর জানে, আমার প্রকৃত শিক্ষক তারাই যারা সত্যিই খুবই আগ্রহী সেইসকল অজানা প্রশ্নের উত্তর জানতে।'' এটা আমারও মনের কথা। কিন্তু আমার Bad Luck. আজ পর্যন্ত আমি আমার মনের মত কোন শিক্ষক পেলাম না।